অধ্যায় ১: যে বৃষ্টি বদলে দিল দুটি জীবন
লেখক: রহমত উল্লাহ
ঢাকার ব্যস্ত শহরে মানুষের ভিড় যেন কখনো কমে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছুটে চলা মানুষগুলোর মাঝে প্রত্যেকেরই লুকিয়ে থাকে একটি করে অজানা গল্প। কেউ স্বপ্নের পেছনে ছুটছে, কেউ হারানো মানুষকে খুঁজছে, আবার কেউ অপেক্ষা করছে এমন একজনের, যে হয়তো একদিন এসে তার জীবন বদলে দেবে।
আরিফও ঠিক তেমনই একজন তরুণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি শুরু করেছে। চাকরি আছে, সম্মান আছে, কিন্তু মন ভরে না। প্রতিদিন একই রুটিনে জীবন কাটতে কাটতে সে বুঝতে শিখেছে, মানুষের সবচেয়ে বড় একাকীত্ব ভিড়ের মাঝেই জন্ম নেয়।
সেদিন ছিল আষাঢ়ের শেষ বিকেল।
আকাশে কালো মেঘ জমে ছিল সকাল থেকেই। অফিস ছুটি হওয়ার কয়েক মিনিট আগে শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি। কাঁচের জানালায় টুপটাপ শব্দ পড়ছিল। সহকর্মীরা একজন একজন করে বেরিয়ে গেলেও আরিফ দাঁড়িয়ে রইল জানালার পাশে।
তার বৃষ্টি খুব প্রিয়।
কারণ ছোটবেলায় মা বলতেন,
"বৃষ্টি কখনো শুধু পানি হয়ে নামে না। কারও জন্য নিয়ে আসে স্মৃতি, কারও জন্য নতুন গল্প।"
মায়ের সেই কথাগুলো আজও তার কানে বাজে।
অবশেষে ছাতা ছাড়াই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল সে।
রাস্তার পাশে একটি ছোট্ট বইয়ের দোকানের টিনের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।
ঠিক তখনই পাশ থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।
"মাফ করবেন... একটু সরে দাঁড়াবেন?"
আরিফ তাকিয়ে দেখল, নীল রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা একটি মেয়ে। ভেজা চুল কাঁধে লেগে আছে। হাতে কয়েকটি বই। বৃষ্টির ফোঁটায় তার মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
সে একটু সরে দাঁড়াতেই মেয়েটি হেসে বলল,
"ধন্যবাদ।"
একটি সাধারণ শব্দ।
কিন্তু সেই হাসিটা যেন অজান্তেই আরিফের মনে কোথাও গিয়ে আটকে গেল।
কিছুক্ষণ দুজনেই নীরবে বৃষ্টি দেখতে লাগল।
হঠাৎ ঝোড়ো বাতাসে মেয়েটির হাত থেকে একটি বই নিচে পড়ে গেল।
আরিফ দ্রুত বইটি তুলে দিল।
বইটির নাম ছিল, 'শেষের কবিতা'।
আরিফ মুচকি হেসে বলল,
"আপনি কি বই পড়তে খুব ভালোবাসেন?"
মেয়েটিও হাসল।
"বই মানুষকে কখনো একা থাকতে দেয় না।"
এই ছোট্ট উত্তরটিই যেন দীর্ঘ আলাপের দরজা খুলে দিল।
জানতে পারল, মেয়েটির নাম মেহরীন।
সে একটি স্কুলে বাংলা পড়ায়।
দুজনেরই বই পড়ার অভ্যাস, বৃষ্টি ভালো লাগে, আর দুজনেই বিশ্বাস করে যে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো কখনো পরিকল্পনা করে শুরু হয় না।
বৃষ্টি থামতে শুরু করেছে।
মেহরীন ব্যাগ থেকে একটি ছোট্ট কাগজ বের করে বলল,
"এটা আমার বুকমার্ক। আজ আপনি না থাকলে বইটা হয়তো ভিজে যেত। এটা আপনার জন্য।"
কাগজের বুকমার্কে সুন্দর হাতে লেখা ছিল,
"কিছু মানুষ হঠাৎ করেই জীবনের প্রিয় অধ্যায় হয়ে যায়।"
কথাটি পড়ে আরিফ কিছু বলার আগেই মেহরীন হালকা হাসি দিয়ে চলে গেল।
সে ভেবেছিল, হয়তো এটাই শেষ দেখা।
কিন্তু ভাগ্য তখনও তাদের গল্পের প্রথম পৃষ্ঠাটিই লিখছিল।
সেই রাতে আরিফ ঘুমাতে পারল না।
বারবার বুকমার্কটি হাতে নিয়ে পড়তে লাগল।
জানালার বাইরে তখনও টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে।
তার মনে হচ্ছিল, জীবনের একঘেয়ে দিনগুলোর মধ্যে যেন নতুন কোনো ঋতু এসে দরজায় কড়া নাড়ছে।
সে জানত না, এই পরিচয় তাকে আনন্দও দেবে, আবার এমন কিছু পরীক্ষার মুখোমুখিও দাঁড় করাবে, যা তার জীবনকে চিরদিনের জন্য বদলে দেবে।
দূরে কোথাও আবার বজ্রপাত হলো।
আকাশ আলোয় ভরে উঠল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে আরিফের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে একটি বার্তা এল।
"আজকের জন্য ধন্যবাদ। আশা করি আবার দেখা হবে।"
বার্তাটি পড়ে তার হৃদস্পন্দন যেন একটু বেড়ে গেল।
সে নম্বরটি কীভাবে পেল?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন...
এ কি শুধুই একটি কাকতালীয় পরিচয়, নাকি বহুদিন আগে থেকেই লেখা ছিল তাদের ভাগ্যের গল্প?
চলবে...

0 Comments